একটি হত্যাকাণ্ডের পর কীভাবে বাংলাদেশ ঢুকে পড়েছিল অভ্যুত্থান, পাল্টা-অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক রক্তপাতের এক অস্থির অধ্যায়ে
শাহ্ জে. চৌধুরী
বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে বলা হয় জাতির পিতা। এই জাতির জন্য তিনি একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে অবশেষে বাঙালি জাতির জন্য স্বতন্ত্র একটি দেশের পত্তন করেছেন, বাংলাদেশ যার নাম। এজন্যই জাতির পিতার মর্যাদায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। তার আগে এ দেশবাসী, বিশেষ করে ছাত্রসমাজ শ্রদ্ধা, সম্মান ও আদর করে তাকে আরেকটি অভিধায় অভিহিত করে। পাকিস্তানি শাসকরা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হয়ে জেল থেকে বেরিয়ে এলে ছাত্ররা তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়ে বরণ করে নেয়। নাম হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার, বেদনাবিধুর ও ক্ষতবিক্ষত দিনগুলোর একটি। ভোরের আগে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদের একটি দল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি, বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান নেতা—নিজ দেশে, নিজ বাড়িতে সশস্ত্র হামলায় নিহত হলেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমস্ সম্পাদকীয়তে লেখে, “আজ এক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, ক্যু’র নেতৃত্বে থাকা তরুণ সেনা অফিসাররা প্রথমে শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবারের ২০ জন সদস্য এবং রাজনৈতিক সহযোগীদের হত্যা করে।
নির্ভরযোগ্য একটি বাংলাদেশি এবং পররাষ্ট্রীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, ১৫ আগস্ট ভোররাতের দিকে ক্যু’র সূচনা হয়। ট্রাক বোঝাই সেনা সদস্যরা শেখ মুজিবের ভাগ্নে এবং দ্য বাংলাদেশ টাইমসের সম্পাদক শেখ মনির বাড়িতে গুলিবর্ষণ শুরু করে। শেখ মনি ও তাঁর স্ত্রীকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়।
প্রায় একই সময়ে, এক মাইল দূরের ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায়, শেখ মুজিবের বাড়িতে আক্রমণ করে সেনাবাহিনীর অফিসাররা। গুলির তাণ্ডব চালায়। আর্টিলারি ব্যবহার করে। আর্টিলারির একটি লক্ষ্য ভুল করা শেল প্রায় এক ডজন মানুষকে হত্যা করেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
শেখ মুজিবের সাথে তার স্ত্রী, দুই ছেলে কামাল এবং জামাল, তাদের দুই নববধূ এবং রাষ্ট্রপতির বারো বছরের ছেলে রাসেল, দার্শনিক বার্ট্রাণ্ড রাসেলের নামে যার নাম রাখা হয়েছিল, সবাইকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়।
আরো হত্যা করা হয়, শেখ মুজিবের ভাই, খুলনার শেখ নাসের এবং ব্রিগেডিয়ার শওকত জামিল চৌধুরী, যাকে সম্প্রতি শেখ মুজিবের সামরিক সচিব পদ থেকে সরিয়ে সামরিক গোয়েন্দা পদে নিযুক্ত করা হয়েছিল।”
প্রকৃতপক্ষে সেদিন শুধু একটি পরিবার রক্তাক্ত হয়নি; বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির গতিপথও আমূল বদলে গিয়েছিল। ইতিহাসের সামনে আজও একটি প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে— ১৫ আগস্ট কি শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার দিন, নাকি এর মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে রক্তের এক দীর্ঘ চক্র?
হত্যার কোনো ন্যায্যতা নেই
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে যে কোনও বিবেকবান মানুষের মতো আমিও গভীরভাবে ঘৃণা করি। একজন মানুষকে রাজনৈতিক কারণে হত্যা করার কোনও নৈতিক, মানবিক বা গণতান্ত্রিক বৈধতা কখনও থাকতে পারে না। একই সঙ্গে আমরা বিশ্বাস করি রাজনৈতিক মতপার্থক্য যত গভীরই হোক না কেন— কোনো মানুষকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড যেমন নিন্দনীয়, তেমনি পৃথিবীর ইতিহাসে সংঘটিত প্রতিটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধেও আমার অবস্থান একই। আমার কাছে মানুষের জীবন কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে বড়। আমি বিশ্বাশ করি, হত্যা নয়—বিচার, প্রতিহিংসা নয়—ন্যায় এবং বন্দুক নয়—গণমানুষের রায়। এই বিশ্বাস থেকেই ১৫ আগস্টকে আমি শুধু আবেগ দিয়ে নয়, ইতিহাসের কঠিন প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে চাই।
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ: স্বপ্নের পাশাপাশি সংকট
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত তরুণ একটি রাষ্ট্র। ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, দুর্বল অর্থনীতি, খাদ্যসংকট, প্রশাসনিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতা—সব মিলিয়ে স্বাধীনতার পরের বাংলাদেশকে কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়েছে। ‘৭৪-এর দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সরকারের প্রতি জনঅসন্তোষ ও রাজনৈতিক বিরোধও ক্রমশ তীব্র হতে থাকে।
এরই মধ্যে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাকশালভিত্তিক একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে দেশ এগিয়ে যায়। সরকার এই পরিবর্তনকে সংকট মোকাবিলার একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখলেও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও সমালোচকদের কাছে এটি ছিল গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করার পদক্ষেপ।
ইতিহাসের এই অধ্যায় নিয়ে বিতর্ক আছে, প্রশ্ন আছে, ভিন্ন ব্যাখ্যাও আছে। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার— কোনো রাজনৈতিক সংকটই একটি হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে পারে না।
১৫ আগস্ট: ক্ষমতার কেন্দ্রে রক্তাক্ত পরিবর্তন
একদল বিপথগামী সেনাসদস্যদের একটি দল ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে বাংলাদেশের স্থপতি ও রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। একই রাতে আরও কয়েকটি স্থানে হামলা চালিয়ে তার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের হত্যা করা হয়। খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশে সামরিক আইন জারি করে।
একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রে ঘটে গেল রক্তাক্ত পরিবর্তন। ক্ষমতা পরিবর্তনের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক পথের পরিবর্তে সামরিক শক্তি হয়ে উঠল রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের হাতিয়ার। এটি শুধু একটি সরকারের পতন ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক গভীর বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত।
রক্ত থামেনি ১৫ আগস্টে
১৫ আগস্টের মাত্র কয়েক মাস পর বাংলাদেশ আবারও প্রবেশ করে অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থানের এক অনিশ্চিত সময়ে। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। আর সেই সময়েই ঘটে বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নিহত হ জাতীয় চার নেতা— সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামান।
মুক্তিযুদ্ধের কঠিন সময়ে যাঁরা বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছর পর তাঁরা কারাগারের ভেতরেই প্রাণ হারালেন। ১৫ আগস্টের রক্ত যেন তখনও শুকানোর আগেই এর ধারাবাহিকতায় থেকেই ‘রক্তের দীর্ঘ চক্র’ কথাটি নতুন অর্থ পেল।
একটি হত্যাকাণ্ডের পর আরেকটি হত্যাকাণ্ড। একটি ক্ষমতার পরিবর্তনের পর আরেকটি ক্ষমতার পরিবর্তন। রাষ্ট্রের নেতৃত্ব বদলায়, কিন্তু রক্তপাত থামে না। ১৯৭৫ সালের বাংলাদেশ সেই নির্মম বাস্তবতারই এক ঐতিহাসিক উদাহরণ। ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ আর আগের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ফিরে যায়নি।
বিচার এলো বহু বছর পর
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারও বাংলাদেশের ইতিহাসের দীর্ঘ ও জটিল অধ্যায়।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই বিচার প্রক্রিয়া স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে যেতে পারেনি। পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক শাসনামলে হত্যাকারীদের দায়মুক্তি ও রাজনৈতিক সুরক্ষার প্রশ্নও জাতীয় বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে।
বহু বছর পর হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। মামলার সাক্ষ্য, প্রমাণ, আসামিদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন ঘটনার বিচারিক বিশ্লেষণ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের নথিতে স্থান পায়। ফলে ১৫ আগস্টের ইতিহাস কেবল হত্যার ইতিহাস নয়— এটি বিচার, জবাবদিহি ও দায়মুক্তির ইতিহাসও।
ইতিহাসের কাঠগড়ায় শুধু ব্যক্তি নয়, রাজনীতিও
১৫ আগস্ট নিয়ে বাংলাদেশের সমাজে আবেগ প্রবল। রাজনৈতিক মতপার্থক্যও গভীর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলের সাফল্য ও ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট, ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ, বাকশাল, রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা—সবকিছু নিয়েই ইতিহাসের আলোচনায় প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রশ্ন করা ইতিহাসেরই অংশ।
কিন্তু প্রশ্ন ও হত্যাকাণ্ড এক জিনিস নয়। একটি সরকারের ভুলের বিচার হতে পারে নির্বাচনে। একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা হতে পারে সংসদে। একটি শাসনের বিরুদ্ধে জনগণ রায় দিতে পারে ব্যালটে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক মতভেদই বন্দুকের গুলিকে ন্যায়সঙ্গত করে না। গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই—ক্ষমতা পরিবর্তনের পথ হবে জনগণের রায়, আইন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া।
অর্ধশতাব্দী পরও ১৫ আগস্ট আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অমোচনীয় প্রশ্ন হয়ে— আমরা কি ইতিহাস থেকে শিখেছি? নাকি এখনও ক্ষমতার জন্য প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার রাজনীতিই আমাদের ভেতরে বেঁচে আছে?
একটি জাতি তখনই পরিণত হয়, যখন সে নিজের ইতিহাসের গৌরব যেমন স্বীকার করতে পারে, তেমনি নিজের অন্ধকারকেও নির্ভয়ে দেখতে পারে।
১৫ আগস্টের সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।




